রাণীরবন্দরে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুকে কপালে ছিলো বলে চালিয়ে দেওয়ার অভিযোগ
রাণীরবন্দরের সড়ক এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। প্রায় প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা, ঝরছে তাজা প্রাণ। অভিযোগ উঠেছে, এসব মৃত্যুকে “কপালে ছিলো, মৃত্যু তো হবেই” বলে স্বাভাবিক হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে সড়কের অব্যবস্থাপনা থেকেই যাচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, যারা নিহত হচ্ছেন, আমরা দ্রুত তাদের ভুলে যাচ্ছি। অথচ তাদের মধ্যে কেউ ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, কেউ ছিলেন পরিবারের একমাত্র সন্তান, আবার কেউ ছিলেন অভিভাবক। একটি দুর্ঘটনা কেবল একটি প্রাণই কেড়ে নিচ্ছে না, একটি পরিবারকে ঠেলে দিচ্ছে অনিশ্চয়তার দিকে।
এর সর্বশেষ উদাহরণ গত ২৮ অক্টোবর ২০২৬। ওইদিন রাণীরবন্দরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মোঃ খলিলুর রহমান (খলিল হাজী) রাণীরবন্দরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন।
হাজির জানাজায় অংশগ্রহণকালে তার পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসীর সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, তিনি ছিলেন একজন সৎ ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক। যেকোনো মানবিক প্রয়োজনে তিনি মানুষের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়াতেন। এমনকি কারো মৃত্যুর সংবাদ পেলে তিনি নিজেও ছুটে যেতেন জানাজায় অংশগ্রহণ করতে।
তার পরিবারের সদস্যরা তাকে হারিয়ে শোকাহত। এ সময় পরিবারের তরুণ দুই সদস্যের সাথে কথা হলে তারা জানান, “এমন অব্যবস্থাপনার জন্য একজন প্রিয় মানুষকে হারিয়ে পরিবার গভীরভাবে শোকাহত। আমরা চাই না আর কেউ এমন ঘটনার শিকার হোক। নিরাপদ সড়কের জন্য আমরা প্রতিবাদ অব্যাহত রাখব এবং সচেতনতামূলক কাজ করে যাব।
শুধু খলিল হাজী নন, এর আগেও একইভাবে প্রাণহানি ঘটেছে অনেকের ।
৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, সকাল ৬টা: বিআরটিসি বাসের সাথে ভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান এক ভ্যান চালকসহ মোট ৪ জন। তাদের পরিচয় ও ঠিকানা-১. নজরুল ইসলাম নাজু (৪৫) – ভ্যানচালক, খানসামা উপজেলা।২. আব্দুল মজিদ (৫০) – যাত্রী, খানসামা উপজেলা।৩. লতা ইয়া চাকমা / নাত্তা ইয়াং চাকমা (৫২) – যাত্রী ও মধু ব্যবসায়ী, টেকনাফ, কক্সবাজার।৪. সাইংহো চাকমা / সাইঙ্গো চাকমা (৪৫) – যাত্রী ও মধু ব্যবসায়ী, টেকনাফ, কক্সবাজার।
২০২৫ সাল:২০২৫ সালের আগস্ট মাসে দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার রানীরবন্দরে ড্রাম ট্রাক ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে ১৪ বছর বয়সী স্কুলছাত্র সৌরভ ইসলাম নিহত হয় এবং তার সঙ্গে থাকা অপর কিশোর গুরুতর আহত হয়।
২৪ মে ২০২৬:পল্লী বিদ্যুৎ অফিস সংলগ্ন এলাকায় ড্রাম ট্রাকের ধাক্কায় অটোর ৪ যাত্রী গুরুতর আহত হন। পরে উত্তেজিত জনতা ওই ড্রাম ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দেয়।
রাণীরবন্দরে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাগুলোর সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাজারের ভেতরে বড় ধরনের কোনো গর্ত নেই। হকার ও দোকানপাট রয়েছে, তবে তা সড়ক থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত। ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যায়, অধিকাংশ বড় আকৃতির যানবাহন – বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস বাজারের ভেতরেই দ্রুত ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলাচল করে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সম্প্রতি দশমাইল টু রংপুর মহাসড়কটি প্রশস্ত করা হয়েছে। ফলে যানবাহনের গতি বেড়েছে। এই অবস্থায় বাজারের ভেতরে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, যানজট নিরসন ও শৃঙ্খলা রক্ষায় ট্রাফিক পুলিশ নিয়োগ এবং ডিভাইডার স্থাপন করা হলে পরিস্থিতির অনেকটা উন্নতি হতো। কিন্তু বাস্তবে এর একটিও নেই, ফলে দুর্ঘটনা থামছে না।
এলাকাবাসীর দাবি, অনতিবিলম্বে রাণীরবন্দর বাজারে ট্রাফিক পুলিশ নিয়োগ ও ডিভাইডার স্থাপন করা হোক। একই সাথে বেপরোয়া গতির যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক, যাতে আর কোনো পরিবারকে তাদের প্রিয়জনকে হারাতে না হয়।
জানা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে স্থানীয়রা কয়েকবার নিরাপদ সড়কের দাবিতে মানববন্ধন ও রাস্তা অবরোধ করেছেন। প্রতিবারই স্থানীয় প্রশাসন আশ্বাস দিয়ে গেছে, কিন্তু বাস্তবে একটি কথাও রাখেনি।